নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় যেকোনো মুহূর্তে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার হার ওই মুহূর্তে উপস্থিত বিক্রিয়কসমূহের সক্রিয় ভরের (মোলার ঘনমাত্রা বা আংশিক চাপ) সমানুপাতিক।
খ) $_9\text{F}$ সর্বাধিক তড়িৎঋণাত্মক মৌল— ব্যাখ্যা করো।
কোনো মৌলের তড়িৎঋণাত্মকতার মান প্রধানত পরমাণুর ক্ষুদ্র আকার এবং নিউক্লিয়াসের উচ্চ আকর্ষণ বলের ওপর নির্ভর করে।
ফ্লোরিনের পারমাণবিক সংখ্যা ৯ এবং এর ইলেকট্রন বিন্যাস হলো: $_9\text{F} \rightarrow 1s^2 2s^2 2p^5$। এটি পর্যায় সারণির ২য় পর্যায়ের গ্রুপ-১৭ (হ্যালোজেন) এর অন্তর্ভুক্ত। একই পর্যায়ের বাম থেকে ডানে গেলে পরমাণুর আকার হ্রাস পায় এবং একই গ্রুপের ওপর থেকে নিচে নামলে আকার বৃদ্ধি পায়। এই নিয়মানুযায়ী পর্যায় সারণির নিষ্ক্রিয় গ্যাস ব্যতীত অন্যান্য সমস্ত সক্রিয় মৌলসমূহের মধ্যে ফ্লোরিন পরমাণুর ব্যাসার্ধ বা আকার ক্ষুদ্রতম। আকার অত্যন্ত ছোট হওয়ায় এর নিউক্লিয়াস যোজনী স্তরের একেবারে নিকটবর্তী থাকে, ফলে শেয়ারকৃত বন্ধন ইলেকট্রন জোড়ের প্রতি এর আকর্ষণ বল মহাবিশ্বের অন্য যেকোনো মৌল অপেক্ষা তীব্রতম হয়। এই সুনির্দিষ্ট মেকানিজমের কারণে পাউলিং স্কেলে ফ্লোরিনের তড়িৎঋণাত্মকতার মান সর্বোচ্চ $4.0$ হয় এবং এটি সর্বাধিক তড়িৎঋণাত্মক মৌল হিসেবে পরিগণিত হয়।
গ) X পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস আউফবাউ নীতির ব্যতিক্রম— ব্যাখ্যা করো।
উদ্দীপকের (i) নং তথ্যানুযায়ী, $_{29}\text{X}$ মৌলটি হলো কপার ($\text{Cu}$, পারমাণবিক সংখ্যা = ২৯)।
আউফবাউ নীতি ($\text{Aufbau Principle}$) অনুযায়ী, পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাসকালে ইলেকট্রনসমূহ প্রথমে সর্বনিম্ন শক্তির অরবিটালে প্রবেশ করে এবং ক্রমান্বয়ে উচ্চ শক্তির অরবিটালে গমন করে। অরবিটালের শক্তির ক্রম নির্ধারণ করা হয় $(n+l)$ নিয়মের সাহায্যে। কপার ($\text{Cu}$) এর ক্ষেত্রে আউফবাউ নীতি অনুযায়ী প্রত্যাশিত এবং বাস্তব ইলেকট্রন বিন্যাসের মেকানিজম নিচে নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. আউফবাউ নীতি অনুযায়ী প্রত্যাশিত ইলেকট্রন বিন্যাস:
কপারের যোজনী স্তরের $3d$ এবং $4s$ অরবিটালের শক্তি গণনা করি:
* $3d$ অরবিটালের জন্য: $n=3, l=2 \Rightarrow (n+l) = 3 + 2 = 5$
* $4s$ অরবিটালের জন্য: $n=4, l=0 \Rightarrow (n+l) = 4 + 0 = 4$
যেহেতু $4s$ অরবিটালের শক্তি কম, তাই আউফবাউ নীতি অনুযায়ী $4s$ অরবিটালে ২টি ইলেকট্রন পূর্ণ হওয়ার পর অবশিষ্ট ৯টি ইলেকট্রন $3d$ অরবিটালে প্রবেশ করার কথা।
প্রত্যাশিত বিন্যাস: $_{29}\text{Cu} \rightarrow 1s^2 2s^2 2p^6 3s^2 3p^6 \mathbf{3d^9 4s^2}$
২. ব্যতিক্রমের মূল কারণ (অরবিটালের প্রতিসাম্যতা ও সুস্থিতি):
কোয়ান্টাম মেকানিক্স বা হুন্ডের নিয়ম অনুযায়ী, সমশক্তিসম্পন্ন অরবিটালসমূহ অর্ধপূর্ণ ($d^5$) কিংবা সম্পূর্ণ পূর্ণ ($d^{10}$) অবস্থায় থাকলে তাদের গোলকীয় প্রতিসাম্যতা বৃদ্ধি পায়। এই প্রতিসাম্যতার (Symmetry) কারণে অরবিটালগুলো অন্য যেকোনো বিন্যাসের চেয়ে অসাধারণ মাত্রায় সুস্থিত বা স্থিতিশীল (Stable) হয়।
কপারের ক্ষেত্রে $3d^9 4s^2$ বিন্যাসে $3d$ অরবিটালটি পূর্ণ হতে মাত্র ১টি ইলেকট্রন বাকি থাকে। তাই যোজনী স্তরকে অধিক সুস্থিত করার লক্ষ্যে কম শক্তির $4s$ অরবিটাল থেকে ১টি ইলেকট্রন স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চ শক্তির $3d$ অরবিটালে স্থানান্তরিত হয়। এর ফলে $3d$ অরবিটালটি সম্পূর্ণ পূর্ণ ($3d^{10}$) এবং $4s$ অরবিটালটি অর্ধপূর্ণ ($4s^1$) সুস্থিত কাঠামো অর্জন করে।
কপারের প্রকৃত ও বাস্তব ইলেকট্রন বিন্যাস:
$$_{29}\text{Cu} \rightarrow 1s^2 2s^2 2p^6 3s^2 3p^6 \mathbf{3d^{10} 4s^1}$$
সিদ্ধান্ত: এই উচ্চ আণবিক সুস্থিতি অর্জনের অনন্য মেকানিজমের কারণেই কপার ($\text{X}$) পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস আউফবাউ নীতির সুনির্দিষ্ট ব্যতিক্রম প্রদর্শন করে।
ঘ) B ও C রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য কোন তড়িৎ চুম্বকীয় বিকিরণ অঞ্চলের হবে? কারণসহ বিশ্লেষণ করো।
উদ্দীপকের (ii) নং চিত্রটি হলো অতিবেগুনি বা ইউভি ($\text{UV}$) রশ্মির সাহায্যে জাল ও আসল টাকা শনাক্তকরণের একটি চমৎকার ব্যবহারিক কৌশল।
চিত্রে আপতিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দেওয়া আছে $200 - 375 \text{ nm}$। আমরা জানি, তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালীতে $10 - 380 \text{ nm}$ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অঞ্চলকে অতিবেগুনি বা ইউভি ($\text{UV}$) অঞ্চল বলা হয়। সুতরাং, আপতিত আলোটি হলো ইউভি রশ্মি। নিচে জাল টাকা (B রশ্মি) এবং আসল টাকা (C রশ্মি) থেকে বিকিরিত রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অঞ্চল কারণসহ বিশ্লেষণ করা হলো:
১. আসল টাকার ক্ষেত্রে C রশ্মির অঞ্চল বিশ্লেষণ:
আসল ব্যাংক নোটে ফসফর ($\text{Phosphor}$) নামক এক বিশেষ রাসায়নিক পদার্থের অদৃশ্য প্রলেপ বা সিকিউরিটি থ্রেড যুক্ত করা থাকে।
* মেকানিজম: আসল টাকার ওপর যখন $200 - 375 \text{ nm}$ এর উচ্চ শক্তির অদৃশ্য ইউভি রশ্মি আপতিত হয়, তখন ফসফর পরমাণুর ইলেকট্রনসমূহ সেই উচ্চ শক্তি শোষণ করে উত্তেজিত হয়ে উচ্চ শক্তিস্তরে লাফিয়ে ওঠে।
* বিকিরণ: উত্তেজিত ইলেকট্রনগুলো যখন পুনরায় পূর্বের মাটিতে বা নিম্ন শক্তিস্তরে ফিরে আসে, তখন শোষিত শক্তির কিছু অংশ তাপ হিসেবে ক্ষয় পায়। ফলে অবশিষ্টাংশ শক্তি যখন আলো হিসেবে বিকিরিত (C রশ্মি) হয়, তখন তার শক্তি আপতিত আলো অপেক্ষা কম হয়। প্ল্যাঙ্কের সমীকরণ ($E = \frac{hc}{\lambda}$) অনুযায়ী, বিকিরিত রশ্মির শক্তি কম হওয়ায় এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ($\lambda$) বৃদ্ধি পায়।
* ফলাফল: এই বর্ধিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মান ইউভি অঞ্চল ছাড়িয়ে $380 - 780 \text{ nm}$ এর মধ্যে পৌঁছায়, যা তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালীর দৃশ্যমান আলো (Visible Light) অঞ্চল। এই দৃশ্যমান আলোর সুনির্দিষ্ট প্রতিপ্রভার (Fluorescence) কারণেই আসল টাকায় উজ্জ্বল সবুজ, নীল বা হলুদ রঙের প্রতিচ্ছবি স্পষ্টভাবে মানুষের চোখে দৃশ্যমান হয়।
২. জাল টাকার ক্ষেত্রে B রশ্মির অঞ্চল বিশ্লেষণ:
সাধারণ বা জাল টাকা তৈরির ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ফসফর বা ফ্লুরোসেন্ট যৌগের প্রলেপ দেওয়া সম্ভব হয় না; এটি সাধারণ কাগজের তৈরি হয়।
* মেকানিজম ও বিকিরণ: জাল টাকার ওপর যখন ইউভি রশ্মি আপতিত হয়, তখন কাগজের পৃষ্ঠতল কোনো অভ্যন্তরীণ ইলেকট্রনীয় শক্তি শোষণ বা ফসফর-ভিত্তিক বিকিরণ ঘটাতে পারে না। আপতিত $200 - 375 \text{ nm}$ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোটিই জাল টাকার কাগজ দ্বারা সরাসরি প্রতিফলিত বা বিকিরিত (B রশ্মি) হয়ে ফিরে আসে।
* ফলাফল: যেহেতু বিকিরিত B রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটে না, সেহেতু এর মান আপতিত আলোর মতোই $200 - 375 \text{ nm}$ সীমার মধ্যেই থেকে যায়। তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালীর এই অঞ্চলটি হলো অতিবেগুনি বা ইউভি ($\text{UV}$) অঞ্চল, যা মানুষের চোখে সম্পূর্ণ অদৃশ্য। ফলে জাল টাকার ক্ষেত্রে কোনো উজ্জ্বল প্রতিপ্রভা বা বিশেষ রঙের আলোকচ্ছটা দেখা যায় না।
<\div style="\text-align: center; margin: 20px 0;">
চিত্র: তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালীতে আণবিক শক্তি শোষণের তারতম্যের ভিত্তিতে B ও C রশ্মির সুনির্দিষ্ট অঞ্চলের অবস্থান।
\div>
সার্বিক সিদ্ধান্ত:
তাত্ত্বিক ও আণবিক রসায়নের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী— জাল টাকা থেকে প্রতিফলিত B রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য অতিবেগুনি (UV) অঞ্চলের ($200 - 375 \text{ nm}$) হবে এবং আসল টাকার ফসফর প্রলেপ থেকে নির্গত C রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোক অঞ্চলের ($380 - 780 \text{ nm}$) অন্তর্ভুক্ত হবে।