HOME সংকরায়ন ও বন্ধন কোণ
ClCClClCl১ নং যৌগN..HHH২ নং যৌগO..HH৩ নং যৌগ
Chittagong • 2023
ক) অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কাকে বলে?
খ) খাদ্যবস্তু সংরক্ষণে খাদ্য লবণ কীভাবে কাজ করে? ব্যাখ্যা করো।
গ) ১নং যৌগের জ্যামিতিক গঠন সংকরায়ণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করো।
ঘ) উদ্দীপকের ২নং ও ৩নং যৌগের বন্ধন কোণের ভিন্নতার কারণ— বিশ্লেষণ করো।

সমাধান (Solution)


ক) অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কাকে বলে?

যেসব রাসায়নিক পদার্থ খাদ্যদ্রব্যের লিপিড ও তেলের স্বতঃজারণ বা মুক্ত মূলক (Free radical) চেইন বিক্রিয়াকে ধীর গতির করে বা সম্পূর্ণরূপে বাধা দিয়ে খাদ্যের পচন ও গন্ধ বিকৃতি রোধ করে, তাদেরকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বলে।

খ) খাদ্যবস্তু সংরক্ষণে খাদ্য লবণ কীভাবে কাজ করে? ব্যাখ্যা করো।

খাদ্য লবণ বা সোডিয়াম ক্লোরাইড ($\text{NaCl}$) প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত একটি অত্যন্ত চমৎকার প্রাকৃতিক প্রিজারভেটিভ। এটি প্রধানত বহিঃঅভিস্রবণ (Exosmosis) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্যবস্তুকে পচন থেকে রক্ষা করে।

খাদ্যবস্তুর (যেমন: মাছ বা মাংস) উপরিভাগে যখন লবণের ঘন প্রলেপ দেওয়া হয়, তখন কোষের বাইরে একটি অতিপৃক্ত বা উচ্চ ঘনত্বের দ্রবণ তৈরি হয়। এর ফলে অভিস্রবণ নিয়মানুযায়ী খাদ্যকোষ এবং তার ভেতরে থাকা ক্ষতিকর অণুজীব বা ব্যাকটিরিয়ার কোষ থেকে ভেতরের সমস্ত পানি কোষঝিল্লি ভেদ করে বাইরে চলে আসে। পানি হারিয়ে অণুজীবের কোষটি সম্পূর্ণরূপে সংকুচিত ও ডিহাইড্রেটেড হয়ে পড়ে। তীব্র পানিশূন্যতার কারণে এনজাইমসমূহ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং ব্যাকটিরিয়াগুলো মারা যায়। এভাবে খাদ্য লবণ অণুজীবের বংশবৃদ্ধি রোধ করে খাদ্যবস্তুকে দীর্ঘকাল সুস্থিত রাখে।

গ) ১নং যৌগের জ্যামিতিক গঠন সংকরায়ণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করো।

উদ্দীপকের ১নং যৌগটি হলো চারটি ক্লোরিন পরমাণু পরিবেষ্টিত একটি কেন্দ্রীয় কার্বন পরমাণু সম্বলিত অণু, অর্থাৎ কার্বন টেট্রাক্লোরাইড ($\text{CCl}_4$)

নিচে কার্বন টেট্রাক্লোরাইড অণুর জ্যামিতিক গঠন সংকরায়ণ ধারণার আলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করা হলো:

১. কেন্দ্রীয় কার্বন পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস ও সংকরণ:
কার্বনের স্বাভাবিক অবস্থার ইলেকট্রন বিন্যাস: $_{6}\text{C} \rightarrow 1s^2 2s^2 2p_x^1 2p_y^1 2p_z^0$
উত্তেজিত অবস্থায় কার্বনের ইলেকট্রন বিন্যাস: $\text{C}^* \rightarrow 1s^2 2s^1 2p_x^1 2p_y^1 2p_z^1$

যৌগ গঠনকালে কার্বন পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ যোজনী শেলের ১টি $2s$ এবং ৩টি $2p$ অরবিটাল পরস্পরের সাথে মিশ্রিত হয়ে সমশক্তিসম্পন্ন এবং সমআকৃতির ৪টি সংকর অরবিটাল উৎপন্ন করে। এই প্রক্রিয়াকে $sp^3$ সংকরণ বলে। উৎপন্ন ৪টি $sp^3$ সংকর অরবিটালের প্রতিটিতে ১টি করে অযুগ্ম বা বেজোড় ইলেকট্রন থাকে।

২. সিগমা বন্ধন গঠন প্রক্রিয়া:
ক্লোরিনের ইলেকট্রন বিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়: $_{17}\text{Cl} \rightarrow 1s^2 2s^2 2p^6 3s^2 3p_x^2 3p_y^2 3p_z^1$
ক্লোরিন পরমাণুর যোজনী স্তরের অসংকরিত $3p_z$ অরবিটালে ১টি বেজোড় ইলেকট্রন থাকে। কার্বনের ৪টি $sp^3$ সংকর অরবিটাল ৪টি ভিন্ন ক্লোরিন পরমাণুর এই $3p_z$ অরবিটালের সাথে একই সরল অক্ষ বরাবর মুখোমুখি উপরিপাতন (Overlapping) ঘটায়। এর ফলে ৪টি সুস্থিত $\text{C}-\text{Cl}$ সিগমা ($\sigma$) বন্ধন গঠিত হয় এবং $\text{CCl}_4$ অণু তৈরি হয়।

৩. জ্যামিতিক আকৃতি ও বন্ধন কোণ:
কার্বনের ৪টি সংকর অরবিটালের ইলেকট্রন মেঘ পরস্পরের স্থিরবৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বলকে সর্বনিম্ন করার জন্য ত্রিমাত্রিক মহাশূন্যে সর্বোচ্চ দূরত্বে অবস্থান নেয়। এর ফলে অণুটির জ্যামিতিক আকৃতি একটি নিখুঁত সুষম চতুস্তলকীয় (Regular Tetrahedral) রূপ ধারণ করে। যেহেতু এই অণুর কেন্দ্রীয় পরমাণুতে কোনো মুক্তজোড় ইলেকট্রন নেই, তাই এর প্রতিটি $\text{Cl}-\text{C}-\text{Cl}$ বন্ধন কোণ আদর্শ $109.5^\circ$ (বা $109^\circ28'$) বজায় রাখে।












C







Cl


Cl


Cl


Cl


109.5°

চিত্র: কার্বন টেট্রাক্লোরাইড ($\text{CCl}_4$) অণুর সুষম চতুস্তলকীয় জ্যামিতিক গঠন।





ঘ) উদ্দীপকের ২নং ও ৩নং যৌগের বন্ধন কোণের ভিন্নতার কারণ— বিশ্লেষণ করো।

উদ্দীপকের সংকেত ও মুক্তজোড় ইলেকট্রন নির্দেশক কাঠামো হতে যৌগ দুটি শনাক্ত করি:
* ২নং যৌগটিতে কেন্দ্রীয় পরমাণুর সাথে ৩টি হাইড্রোজেন যুক্ত এবং মাথায় একজোড়া মুক্তজোড় ইলেকট্রন রয়েছে। অর্থাৎ, এটি হলো অ্যামোনিয়া ($\text{NH}_3$)
* ৩নং যৌগটিতে কেন্দ্রীয় পরমাণুর সাথে ২টি হাইড্রোজেন যুক্ত এবং মাথায় দুজোড়া মুক্তজোড় ইলেকট্রন রয়েছে। অর্থাৎ, এটি হলো পানি ($\text{H}_2\text{O}$)

অ্যামোনিয়া ($\text{NH}_3$) এবং পানি ($\text{H}_2\text{O}$) উভয়ের केंद्रीय পরমাণুর যোজনী স্তরে $sp^3$ সংকরণ ঘটে। $sp^3$ সংকরণের স্বাভাবিক জ্যামিতিক আকৃতি চতুস্তলকীয় এবং আদর্শ বন্ধন কোণ $109.5^\circ$ হওয়ার কথা থাকলেও অণু দুটির বাস্তব বন্ধন কোণ যথাক্রমে $107^\circ$ এবং $104.5^\circ$ হয়। এদের বন্ধন কোণের এই ভিন্নতার মূল কারণ ভ্যালেন্স শেল ইলেকট্রন পেয়ার রিপালশন (VSEPR) তত্ত্ব এবং কেন্দ্রীয় পরমাণুতে বিদ্যমান মুক্তজোড় (Lone Pair) ইলেকট্রনের সংখ্যার তারতম্য

নিচে VSEPR তত্ত্বের আলোকে আণবিক মেকানিজম বিশ্লেষণ করা হলো:

১. VSEPR তত্ত্বের মূলনীতি:
তত্ত্বানুযায়ী, পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ যোজনী স্তরের ইলেকট্রন জোড়সমূহ (বন্ধনজোড় ও মুক্তজোড়) পরস্পরের মধ্যে তীব্র বিকর্ষণ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন প্রকার ইলেকট্রন জোড়ের বিকর্ষণ বলের নিম্নোক্ত তীব্রতার ক্রম মেনে চলে:
$\text{মুক্তজোড়-মুক্তজোড় (LP - LP)} > \text{মুক্তজোড়-বন্ধনজোড় (LP - BP)} > \text{বন্ধনজোড়-বন্ধনজোড় (BP - BP)}$

২. ২নং যৌগ— অ্যামোনিয়া ($\text{NH}_3$) অণুর বিশ্লেষণ:
অ্যামোনিয়ার केंद्रीय পরমাণু নাইট্রোজেনের ($_{7}\text{N}$) যোজনী স্তরে মোট ৫টি ইলেকট্রন থাকে। ৩টি হাইড্রোজেনের সাথে ৩টি বন্ধনজোড় (BP) গঠনের পর ১টি মুক্তজোড় (LP) ইলেকট্রন অক্ষত থাকে। এই ৪ জোড়া ইলেকট্রন ধারণের জন্য নাইট্রোজেনে $sp^3$ সংকরণ ঘটে। কিন্তু অণুতে ১টি মুক্তজোড় ইলেকট্রন থাকায় তা পার্শ্ববর্তী ৩টি বন্ধনজোড়কে $\text{LP-BP}$ বিকর্ষণ বল দ্বারা নিচের দিকে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। এই অক্ষীয় চাপের ফলে $\text{N}-\text{H}$ বন্ধনসমূহ একে অপরের কাছাকাছি সরে আসে। ফলস্বরূপ বন্ধন কোণ আদর্শ মান $109.5^\circ$ থেকে সংকুচিত হয়ে $107^\circ$ এ দাঁড়ায় এবং অণুটির আকৃতি ত্রিকোণাকার পিরামিডীয় হয়।

৩. ৩নং যৌগ— পানি ($\text{H}_2\text{O}$) অণুর বিশ্লেষণ:
পানির কেন্দ্রীয় পরমাণু অক্সিজেনের ($_{8}\text{O}$) যোজনী স্তরে মোট ৬টি ইলেকট্রন থাকে। ২টি হাইড্রোজেনের সাথে ২টি বন্ধনজোড় (BP) গঠনের পর অক্সিজেনের মাথায় ২টি মুক্তজোড় (LP) ইলেকট্রন অবস্থান করে। এখানেও ৪ জোড়া ইলেকট্রনের কারণে অক্সিজেনে $sp^3$ সংকরণ ঘটে। তবে পানিতে মুক্তজোড় ইলেকট্রন সংখ্যা ২টি হওয়ায় তাদের নিজেদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা তীব্র $\text{LP-LP}$ বিকর্ষণ ঘটে। এই তীব্র বিকর্ষণের কারণে মুক্তজোড় দুটি দুই দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং একই সাথে সংলগ্ন ২টি বন্ধনজোড়কে দ্বিগুণ শক্তিতে ভেতরের দিকে ঠেলে দেয় ($\text{LP-BP}$ বিকর্ষণ)। ফলে পানির বন্ধন কোণ অ্যামোনিয়া অপেক্ষা অনেক বেশি সংকুচিত হয়ে $104.5^\circ$ এ নেমে আসে এবং অণুটির আকৃতি কৌণিক বা উল্টানো 'V' এর মতো হয়।

গাণিতিক ও তাত্ত্বিক তুলনা:
* কেন্দ্রীয় সংকরণ দশা: $\text{NH}_3 \equiv sp^3$ এবং $\text{H}_2\text{O} \equiv sp^3$
* মুক্তজোড় ইলেকট্রন সংখ্যা: $\text{NH}_3 \rightarrow 1 \text{টি}$ এবং $\text{H}_2\text{O} \rightarrow 2 \text{টি}$
* বাস্তব বন্ধন কোণ: $\angle\text{H-N-H } (107^\circ) > \angle\text{H-O-H } (104.5^\circ)$

সিদ্ধান্ত: অতএব, পুঙ্খানুপুঙ্খ রাসায়নিক বিশ্লেষণ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, কেন্দ্রীয় পরমাণুতে মুক্তজোড় ইলেকট্রনের সংখ্যার ভিন্নতা এবং তজ্জনের বিকর্ষণ বলের তীব্রতার তারতম্যের কারণেই উদ্দীপকের ২নং ও ৩নং যৌগের বন্ধন কোণের মধ্যে দৃশ্যমান ভিন্নতা দেখা যায়